
অনলাইন ডেক্সঃ ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেট। রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারীদের এ মোড় ব্যবহার করতে হয়। আবার এলাকাটিও গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার সমন্বয়ে। মানুষ ও যানবাহনের চলাচল বেশি হওয়ায় এখানে যানজটও বেশি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তথ্য বলছে, গত ২ সেপ্টেম্বর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালুর পর থেকে এখান দিয়ে প্রতিদিন চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যার সঙ্গে নতুন করে আরো পাঁচ হাজার যুক্ত হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন চালু হলে এখান দিয়ে আরো প্রায় ৫০ হাজার মানুষের চলাচল বাড়বে।
যানবাহন ও জনসমাগম বাড়লেও ফার্মগেটের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। উল্টো প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে সড়ক ও মানুষের চলার পথ। এ পরিস্থিতিতে স্টেশনটি চালুর পর ফার্মগেটে যানজট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছে রাজধানীর ট্রাফিক বিভাগ।
ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ার আগে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ, ফার্মগেট ও তেজগাঁওকেন্দ্রিক দৈনিক গড়ে ১৫ হাজারের মতো যানবাহন চলত। এক্সপ্রেসওয়ে চালুর পর যানবাহনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার বেড়েছে। অন্যদিকে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলে (এমআরটি লাইন-৬) দৈনিক গড়ে পাঁচ লাখ মানুষ যাতায়াত করার প্রাক্কলন রয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফার্মগেট স্টেশনে যাত্রী সমাগম হতে পারে দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার। যদিও বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে এ এলাকার সড়ক অবকাঠামোর তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। উল্টো ফার্মগেট মোড়ে মেট্রোরেলের পিলার নির্মাণ করে সড়ককে আরো সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেলের একটি পিলার পড়েছে রাস্তার ঠিক মাঝখানে। অন্যদিকে ফার্মগেটে রাস্তার মাঝখানে পিলার গড়ে তোলা হয়েছে এক্সপ্রেসওয়ের জন্যও। সম্প্রতি সংস্কার করা ফুটওভারব্রিজটিও ফার্মগেটের মূল সড়ককে সংকুচিত করেছে। সামগ্রিকভাবে এ এলাকার যোগাযোগ অবকাঠামোগুলোয় বড় ধরনের প্রকৌশলগত ত্রুটি রয়েছে বলে মনে করছে ট্রাফিক বিভাগ।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো নির্মাণের আগে ‘ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করা জরুরি ছিল বলে মনে করেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘যোগাযোগ অবকাঠামো সম্পর্কিত যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব সংস্থা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের মধ্যে সঠিক সমন্বয়ও প্রয়োজন। ফার্মগেটকেন্দ্রিক যানবাহনের কিছুটা বাড়তি চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পেছনে সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রকৌশলগত কিছু পর্যবেক্ষণ আমাদের রয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোর স্টেশন চালু হতে যাচ্ছে। সেখানে প্রচুর যাত্রী সমাগম হবে। যানবাহনের বাড়তি চাপ ও মেট্রোরেলের যাত্রী সমাগম ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার একটি চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু অবকাঠামো উন্নয়নের সুপারিশও আমাদের রয়েছে।’
ট্রাফিক বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, সুষ্ঠু যান চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং যানজট নিরসনের জন্য ফার্মগেট এলাকার প্রকৌশলগত ত্রুটিগুলো দূর করা জরুরি। পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আন্ডারপাস ও রিং রোডের অবকাঠামো নির্মাণ এবং খামারবাড়ীর বঙ্গবন্ধু চত্বর ছোট করে রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তারা।
ফার্মগেট এলাকার যানজট নিরসনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, জানতে চাইলে মুনিবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকার মধ্যে এখন উত্তরা, বনানী, গুলশান এলাকায় কোনো যানজট নেই। যানজট হচ্ছে শুধু বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকায়। এ যানজট কমাতে হলে মেট্রোরেলের অ্যালাইনমেন্ট ধরে খামারবাড়ী থেকে ফার্মগেটের দিকে একটি ওভারপাস নির্মাণ করা প্রয়োজন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প ধরে নামা যানবাহনগুলো ওই ওভারপাস ধরে পশ্চিম ও পূর্ব দিকে চলে যাবে। আর আন্ডারপাস দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে চলে যাবে। মেট্রো স্টেশন থেকে বের হওয়া যাত্রীদের রাস্তা পারাপারের জন্য আন্ডারপাস করা যেতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় তেজগাঁও এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
মেট্রোরেল স্টেশনটি চালুর পর ফার্মগেটে যানজট তীব্র হতে পারে বলে ট্রাফিক বিভাগের এ আশঙ্কার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ফার্মগেট এলাকাটিকে জটিল করে তুলেছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল প্রকল্প। এ এলাকার যানবাহন চলাচল যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করেই এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে আসা গাড়ি ফার্মগেটের যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা ১০ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেটে আসার ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু ফার্মগেটে এসেই তো গাড়িগুলো যানজটে আটকা পড়ছে। তাহলে লাভটা হলো কী? এর জন্য তো এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের আগেই সঠিকভাবে সমীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। আমি বলব, যারা এর পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন তারা কাজগুলো যথাযথভাবে করতে পারেননি।’
তিনি বলেন, ‘ফার্মগেটের পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলবে মেট্রোরেল। এ স্টেশনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করবে। স্টেশন থেকে নেমেই কিন্তু তারা আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতে যাবে। কিন্তু স্টেশন থেকে নেমে তাদের যাওয়ার জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ অবকাঠামো তো আমরা গড়তে পারিনি। আবার যেসব যাত্রী ধানমন্ডি, মানিক মিয়া এভিনিউ, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুরের দিকে যাবে, তাদের জন্যও সুবিধাজনক কোনো অবকাঠামো নেই। ফলে মেট্রো স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীরা সমস্যায় পড়বেন, যা শেষমেশ যানজট বাড়ানোয় ভূমিকা রাখবে।’
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ফার্মগেট এলাকায় যাত্রীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার বদলে স্টেশন প্লাজার মতো বাণিজ্যিক অবকাঠামো করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। এর ফলে ফার্মগেট স্টেশনে জনসমাগম আরো বাড়বে, যা কার্যত এ এলাকার যানজট বাড়াতেই ভূমিকা রাখবে।’
সুত্র ও ছবিঃ বণিক বার্তা