
অনলাইন রিপোর্টঃ নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে ৮৮টি লাইটার জাহাজের সনদ স্থগিত করায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বড় জাহাজের অপেক্ষার সময় বেড়ে ২০ দিন পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাজারদরে। সংশ্লিষ্ট জাহাজ মালিকদের দাবি, সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ টন পণ্য খালাসের সক্ষমতা কমেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য নিয়ে বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল নোঙর করে। এসব জাহাজ থেকে পণ্য ছোট জাহাজে তুলে দেশের বিভিন্ন ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছোট জাহাজগুলোই লাইটার জাহাজ নামে পরিচিত। কিন্তু নিয়ম মেনে চলাচল নিশ্চিত করতে ৮৮টি লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করায় পণ্য পরিবহনের এ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আগে যেখানে একটি বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ঘাটে পৌঁছাতে সাধারণত সাত থেকে আট দিন লাগত, সেখানে এখন অপেক্ষার সময় ২০ দিন পর্যন্ত গড়াচ্ছে। বড় জাহাজকে দীর্ঘ সময় বহির্নোঙরে অবস্থান করতে হওয়ায় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ বা ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিদিন ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়
বড় জাহাজ বন্দরের বহির্নোঙরে নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার ডেমারেজ দিতে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পণ্য খালাসে দেরি হলে এ ব্যয় আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সাথে সমন্বয় করেন। ফলে লাইটার জাহাজের সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ ভোক্তাদেরও বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের বিভিন্ন নৌপথে অন্তত ১ হাজার ২০০ লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। এসব জাহাজের একটি বড় অংশ বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী জাহাজের সিরিয়াল নির্ধারণ করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসি)।
নিয়ম অনুযায়ী, ডব্লিউটিসির বরাদ্দ বা ছাড়পত্র নিয়ে লাইটার জাহাজের বহির্নোঙরে যাওয়ার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু জাহাজ মালিক নির্ধারিত সিরিয়াল না মেনে এবং কম ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের প্রস্তাব দিয়ে কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে নিয়ম মেনে সিরিয়াল ধরে অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলো কাজ পাচ্ছে না।
৪০০ জাহাজের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
ডব্লিউটিসির অভিযোগ, প্রায় ৪০০ লাইটার জাহাজ সংগঠনের নির্ধারিত সিরিয়াল অনুসরণ না করে পণ্য পরিবহন করছে। বিষয়টি যাচাই করে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানানো হয়। এর পর কয়েক দফায় ৮৮টি জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়েছে।
ডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, নিয়ম না মানায় প্রায় ৪০০ জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। অভিযোগ যাচাইয়ের পর ৮৮টি জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়েছে। এসব জাহাজের মালিকেরা সংগঠনের নিয়ম লঙ্ঘন করে চলাচল করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কম ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের প্রস্তাব দিয়ে কাজ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির নেতা হাজি শফিক বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ডব্লিউটিসির অধীনে জাহাজ পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু কিছু জাহাজ মালিক নিয়ম-শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে কম ভাড়ায় পণ্য পরিবহনে যুক্ত হওয়ায় নিয়ম মেনে চলা মালিকেরা কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে সনদ স্থগিতের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কেন বড় জাহাজকে বহির্নোঙরে থাকতে হয়
চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেল দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা বা ড্রাফট গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের চ্যানেল দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচল করতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা বড় জাহাজগুলোর অনেকটির ড্রাফট ১২ মিটার বা তার বেশি। এ কারণে এসব জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না।
বড় জাহাজগুলোকে বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করতে হয়। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে পণ্য ছোট ছোট চালানে ঘাটে নেওয়া হয়। প্রতিটি লাইটার জাহাজ একবারে প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টন পণ্য পরিবহন করতে পারে। সাধারণত চার-পাঁচটি লাইটার জাহাজের মাধ্যমে একটি বড় জাহাজের পণ্য সাত থেকে আট দিনের মধ্যে খালাস করা সম্ভব হয়।
কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী লাইটার জাহাজ না পাওয়ায় বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সনদ স্থগিত হওয়া জাহাজগুলো বহির্নোঙরে যেতে না পারায় ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী সনদ স্থগিত
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে কয়েক দফায় ৮৮টি লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিতের কথা জানানো হয়েছে। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এসব চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দর ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় পণ্য পরিবহন সুশৃঙ্খল রাখতে ২০২৪ সালে প্রণীত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। নীতিমালার ৭.১ ধারা অনুযায়ী, ডব্লিউটিসির বরাদ্দ বা ছাড়পত্র ছাড়া কোনো লাইটার জাহাজ সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় নদীবন্দর, জেটি কিংবা বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় জাহাজ থেকে পণ্য পরিবহন করতে পারবে না। এ নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের সনদ বা অনুমতিপত্র স্থগিত কিংবা বাতিল করার সুযোগ রয়েছে।
তবে নিজস্ব কারখানা বা শিল্পগোষ্ঠীর পণ্য পরিবহনের জন্য নিজস্ব লাইটার জাহাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত জাহাজ প্রয়োজন হলে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে বরাদ্দ নিতে হবে।
সংকট পুরোপুরি কাটেনি
চলতি মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অন্তত ৫০টি বড় জাহাজ অবস্থান করছিল। এসব জাহাজে চিনি, সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল, লবণ, গমসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্য রয়েছে। জাহাজের ড্রাফট বেশি হওয়ায় অধিকাংশ পণ্য বহির্নোঙরেই খালাস করতে হবে।
ডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, প্রায় ১০ দিন আগেও লাইটার জাহাজের সিরিয়াল বণ্টন সীমিত করে দিতে হয়েছিল। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বহির্নোঙরে পণ্যবাহী বড় জাহাজের সংখ্যা আবার বাড়লে লাইটার জাহাজের সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
তাঁর মতে, সনদ স্থগিত হওয়া জাহাজগুলো নিয়ম মেনে পরিবহন কাজে যুক্ত হলে সংকট অনেকটাই কমে আসবে। তবে স্থগিতাদেশ কবে প্রত্যাহার করা হবে, সে বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।